বাংলা ভাষায় বঙ্গ ও বঙ্গবাসী নিয়ে আলোচনা ও সেই সংক্রান্ত ই-বুকের সংগ্রহালয়ে আপনাকে স্বাগত। ইতিহাস থেকে ভ্রমণ, সমাজ, সংস্কৃতি , প্রকৃতি, পরিবেশ নিয়ে যা কিছু বাংলার তাই আমাদের আলোচ্য। আমাদের ব্লগে আপনার যাত্রা শুভ হোক।

শনিবার, ১৮ মে, ২০২৪

কোচবিহার কিছুকথা কিছু ইতিহাস - শোভেন সান্যাল

এটা অত্যন্ত দুঃখের কথা যে পুরাতাত্ত্বিক ঐশ্বর্যের বিচারে পশ্চিমবঙ্গে কোচবিহার জেলার যে গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল কোচবিহার তা পায়নি। অথচ বাংলার ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মৃতিচিহ্ন কোচবিহার জেলার পথে প্রান্তরে অত্যন্ত অবহেলার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে আর নিঃশব্দে ঘোষণা করে চলেছে যে আত্মবিস্মৃত বাঙালিজাতির কোনও ইতিহাসবোধ নেই।

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের শুধু এই উক্তিই নয়, তার দেবী চৌধুরানী উপন্যাসও বহু লোকে পড়েছেন। কিন্তু অনেকেই মনে রাখেননি স্বামী পরিত্যক্তা অসহায়া গ্রাম্য তরুণী প্রফুল্লর দেবী চৌধুরানীতে রূপান্তরের নেপথ্য ইতিহাস। প্রফুল্ল যদি পোড়ো বাড়িতে মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ বৈষ্ণবের আবিষ্কৃত রাজা নীলাম্বরের গুপ্তধনের উত্তরাধিকারী না হত তাহলে তার সোনার মোহর ভাঙানোর দরকার হত না। আর তাহলে তার ভবানী পাঠকের সাহায্য লাভের দরকারও হত কিনা সন্দেহ। আর ভবানী পাঠককে এভাবে দরকার না হলে প্রফুল্লর দেবী চৌধুরানীতে রূপান্তরও এভাবে হত না।

এ তো গেল প্রফুল্লর কথা। কিন্তু এই যে রাজা নীলাম্বরের কথা বঙ্কিমচন্দ্র লিখে গেছেন, তিনি কে, সে সম্বন্ধে বাঙালি পাঠকেরা বিশেষ কেউই উৎসাহ বোধ করেন না। কারণ তাকেও তারা অনেকেই উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্র বলেই মনে করেন। অথচ রাজা নীলাম্বর রীতিমতো এক ঐতিহাসিক চরিত্র, আর সাহিত্য সম্রাট তা শুধু জানতেনই না, তার রাজধানী কামতাপুরেরও খোঁজ খবর রাখতেন তিনি। সেই কামতাপুর নগর সম্বন্ধে তিনি কী বলেছেন তা তার ভাষাতেই দেখা যাক এখানে।

“ইহার পরিধি ৯১/২ ক্রোশ, অতএব নগরী অতি বৃহৎ ছিল সন্দেহ নাই। ইহার মধ্যে সাত ক্রোশ বেড়িয়া নগরীর প্রাচীর ছিল। আর ২১/২ ক্রোশ একটি নদীর দ্বারা রক্ষিত। প্রাচীরের ভিতর প্রাচীর; গড়ের ভিতর গড়— মধ্যে রাজপুরী।”

এই সুপ্রাচীন সুবৃহৎ কামতাপুর শহর কোথায়, উত্তরবঙ্গে বাস করেও অনেকেই তা জানেন না। কোচবিহার শহর থেকে দিনহাটা মহকুমা শহরের প্রায় দশ কিলোমিটার পশ্চিমে এখনকার গোঁসানিমারি গ্রামটি এই প্রাচীন কামতাপুর শহরের প্রধান স্থান।

রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

কলকাতার প্রতিবেশী - পীযূষ কান্তি রায়

তিলোত্তমা কলকাতা। বিচিত্র তার ইতিহাস। ভারতবর্ষে বলতে গেলে, ইংরেজ শাসনের শুরু এ বন্দর নগরীর পথ ধরে যার আধুনিক পর্বের ভিত্তি স্থাপন করে ছিলেন জোব চার্নক। তারপর থেকে এখানে এসেছে নানা বিদেশী জাতি রুটি-রুজি ও স্ব স্ব ধর্ম পালনের অলিখিত অধিকারে। তাদের অনেকে বিদায় নিয়েছে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করার পরে পরেই। কলকাতা যখন বন্দর নগরীর মর্যাদা পায় নি, তখনও তার মর্যাদা ছিল। শিখ ধর্মের প্রবর্ত্তক গুরু নানকদেব সেই ১৫১০ খৃঃ এ গ্রামে এসে ছিলেন। নবমগুরু ত্যাগবাহাদুরও এসেছিলেন এখানে । গবেষকের দৃষ্টিতে কলকাতার এসব প্রতিবেশীদের কাহিনী।


শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০২৪

গ্রাম-গঞ্জের গাছগাছড়া - ড. রবীন্দ্রনাথ সর

প্রাণময় পৃথিবীতে মানুষের আগেই এসেছে নানা ধরনের গাছপালা। এই গাছগাছড়া থেকে আদিমকাল থেকে মানুষ খাদ্য, বস্ত্র, ঔষধ, বাসস্থানের উপকরণ সমূহ সংগ্রহ করেই চলেছে। গাছের স্নিগ্ধ-সুশীতল ছায়া যেমন পাই, তেমনি পাই নৈসর্গিক আনন্দও। গাছপালাকে ঘিরে বহু কাব্য কাহিনি ও রচিত হয়েছে। হাজার হাজার প্রজাতির গাছপালার গঠন-প্রকৃতি, বংশবিস্তার পদ্ধতি, বাসস্থান, জীবনযাপন প্রক্রিয়া কতই না বিস্ময়কর, কত বৈচিত্র্যময়। এর কতটুকুই বা আমাদের জানা।

আলোচ্য বইটিতে গ্রাম-গঞ্জে পাওয়া যায় এমন ছোট বড় কয়েকটি গাছের কথা আলোচনা করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। এদের স্থানীয় নাম, আকার-আকৃতি, পাতা-ফুল-ফল বীজের কথা; বিন্যাস, বিস্তার ও বাসস্থান সম্বন্ধে যেমন কিছু জানা যাবে, তেমনি জানা যাবে এই সব উদ্ভিদের রাসায়নিক উপাদান ও ভেষজগুণের কথাও। বইটি বিভিন্ন স্তরের ছাত্র-ছাত্রী, সাধারণ মানুষ ও প্রকৃতিপ্রেমীদের অবশ্যপাঠ্য।


বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

বাংলা মৌখিক সাহিত্যের রূপান্তর - বন্দনা ভট্টাচার্য্য

একটি দেশের সাহিত্যকে সাধারণভাবে দুটি ভাগে ভাগ দরা যায়—মৌখিক সাহিত্য ও লিখিত সাহিত্য। আবার এই সাহিত্য যে সমাজের সৃষ্টি সেই সমাজ ও সেই সময়কার বিশেষ বিশেষ ঘটনা নিয়েই তৈরি হয় সাহিত্য। সুতরাং অগ্রগতির দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে, যে কোনও দেশের মৌখিক সাহিত্য সেই দেশের লিখিত সাহিত্যের তুলনায় প্রাচীনতর। মানুষ যখন এক-একটি গোষ্ঠীবদ্ধ অবস্থায় বাস করত তখনই প্রতিটি সম্প্রদায়ের মৌখিক সাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। এই সাহিত্য বিশেষভাবে নিরক্ষর শ্রেণীহীন সম্প্রদায়ের সামগ্রিক ফসল, কোনও বিশেষ সম্প্রদায় ও ব্যক্তিবিশেষের সৃষ্টি নয় বলেই মনে হয়।

বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজের মধ্যে লিখিত সাহিত্য হাজার বছর ধরে চলে আসছে সত্য কিন্তু অলিখিত সাহিত্যের সমৃদ্ধি ও গতি তারই পাশাপাশি অব্যাহত থেকে গেছে। প্রকৃতপক্ষে অলিখিত সাহিত্য প্রথমে লিখিত সাহিত্যকে ভাব ও প্রেরণা জুগিয়েছে ; কিন্তু নিজের সজীবতা ও প্রাণশক্তিকে কখনওই হারিয়ে ফেলেনি। অলিখিত সাহিত্যের এই আশ্চর্য প্রাণশক্তির মূল কারণ সম্ভবত এই সাহিত্যের নিয়ত পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত অবস্থা। কোনও বিশেষ ভাবধারা বা চিন্তাধারাকে মেনে নিয়ে এর গতি থেমে থাকেনি। তাই দেখা যায় প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য অনেকাংশেই প্রচলিত সাহিত্য থেকে প্রেরণা লাভ করেছে। আসলে আমাদের দেশের এক বিরাট অংশের জনগণ অশিক্ষিত থাকায় অলিখিত সাহিত্য তাদের মনের খোরাক জুগিয়েছে। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলার সমাজ-জীবনে যে বিরাট পরিবর্তন ঘটে তাতে পুরোনো যা কিছু তাকে বিসর্জন দিয়ে নতুনকে গ্রহণ করার একটা প্রবণতা দেখা যায়। ফলে প্রাচীন ভাবধারা ও তার বৈচিত্র্য এক বিরাট ভাঙনের মুখে এসে দাঁড়ায়। এই অবস্থায় অলিখিত সাহিত্য সাধারণভাবেই একটা বিপর্যয়ের সামনে উপস্থিত হয়। যদিও তার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও ঐতি আজও বর্তমান।


শনিবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সমকালীনদের চোখে কলকাতার ঘটনাবলী - সংকলন ও সম্পাদনা শংকর রুদ্র

অতীত অবশ্যই কথা বলে, ভবিষ্যতের মতো মৌন-মূক নয়। অতীতের বুকে জমা থাকে অনেক কথা—অনেক দিনের কথা। আশ্চর্য সে সব কথা বিস্মৃতির অন্তরালে চির গোপন থেকে যায়, যদি না অতীতকেই বাঙময় করে তোলা যায়। আর তার জন্য অতীতের কাছেই সাধ্য-সাধনা করতে হয় ।

এই পৃথিবীর সব বস্তুরই অতীত আছে। প্রকৃতির আছে—মানুষের আছে —মানুষের সৃষ্ট সব বস্তুর আছে। সেই মতো মানুষের গ্রাম-জনপদ শহর সবেরই আপন-আপন অতীত আছে। এই অতীত কাহিনী গাথা ইতিহাসের মতোই বহু ঘটনায় সমৃদ্ধ। সবিস্তারে তা বিধৃত হয়েছে ভাষায় সাহিত্যে রচনায়। তারই মধ্যে পৃথিবীর অতীতকে আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি। তেমনি আমরা আমাদের এই প্রিয় শহর কলকাতার অতীত –কলকাতার ইতিহাসও চোখের নজরে দেখতে পাই।

কিন্তু সেই অতীত গবেষক ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে যতই দেখি না কেন তার মধ্যে কোথায় যেন এক অপূর্ণতা রয়ে যায়। এই অপূর্ণতা ঘুচে যায় সম সাময়িকদের রচনায় অতীত দর্শনে। কারণ সমসাময়িকদের দৃষ্টিতে নিজ নিজ কাল কখনো মিথ্যা প্রতিপন্ন হয় না—সমকালের ঘটনা আদৌ অসত্য হয় না। হয়ত বর্ণনায় ইতর বিশেষ ঘটতে পারে— ভাবালুতার আধিক্যও ঘটতে পারে। হয়ত স্থান-কাল-পাত্রেরও কিছু ত্রুটি-বিচ্যূতি ঘটতে পারে। কিন্তু তাকে ব্যতিক্রম বলে গণ্য করা যায় না। বরং সমকালীনদের চোখে দেখা জগত-সংসার-কাল একটা বিশ্বাস যোগ্যতা অর্জন করে থাকে। এই বিশ্বাসযোগ্যতাকে কোনো প্রকারেই অস্বীকার করা যায় না।